ভারতের টাটা কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা জামশেদজি টাটা।স ভারতের প্রথম পরমাণু বিজ্ঞানী হোমি জাহাঙ্গীর বাবা। বলিউড অভিনেতা বোমান ইরানি। এদের সবার মধ্যে একটি মিল রয়েছে, সেটা হলো এরা সবাই এমন এক সম্প্রদায় থেকে এসেছে যাদের সংখ্যা ভারতবর্ষে অনেক কম। কিন্তু এরা ভারতের সবচেয়ে ধনী এবং সফল সম্প্রদায়। যার নাম পার্সি।
ভারতের উত্থান কোথাও না কোথাও পার্সিদের ছাড়া অসম্পূর্ণ। ভারতের প্রথম স্টিল মিল, কমার্শিয়াল বিমান, প্রথম রাজকীয় হোটেল এবং এশিয়ার প্রথম স্টক এক্সচেঞ্জ। এসব কিছুর পেছনে পার্সীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এতকিছুর পরেও পার্সিদের উৎপত্তিস্থল কিন্তু ভারত নয়।
পার্সি শব্দের অর্থ পার্সিয়ান। আজকের দিনে আমরা এই ভাষাটা ব্যবহার করি ওই নির্দিষ্ট সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে বোঝানোর ক্ষেত্রে, যারা খ্রিষ্টীয় ৮ম থেকে ১০ম শতাব্দীতে ইরান থেকে ভারতে এসেছিলো। পার্সি সম্প্রদায়ের লোকেরা যে ধর্মে বিশ্বাস করতো তাকে জরাথুস্ত্রবাদ বলে।
জরথুস্ত্রবাদ ধর্মকে মনে করা হয় এই পৃথিবীর অনেক প্রাচীন এবং একেশ্বরবাদী ধর্ম। যা ইরানে শুরু হয়েছিল প্রায় চার ৪০০০ বছর আগে।
(৬৩৩-৬৫৪) খ্রিস্টাব্দে পারস্য মুসলিম খিলাফতের অন্তর্ভুক্ত হয়। তখন এই ধর্মের অনেক মানুষ ইরান থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে পাড়ি জমায়।
দুটি কারণে তারা ভারতীয় উপমহাদেশে এসেছিলেন।
• প্রথমতঃ তাদের জাতিসত্তা এবং ঐতিহ্যকে বাঁচানোর জন্য।
• দ্বিতীয়তঃ অর্থনৈতিক কারণে।
অনেক পার্সি ব্যবসায়ী ভারতে চলে আসেন। কেননা ভারতবর্ষ তখনও ছিল সুজলা-সুফলা। এখানকার উৎপাদিত কৃষি জাত পণ্যের চাহিদা সারা বিশ্বময়।
আরও পড়ুন: এক রহস্যময় গ্রাম আল-মাদাম
তারা আরব সাগর পাড়ি দিয়ে ভারতের ‘দিও’ নামক এক দ্বীপে আশ্রয় নেয়। ওইখানে তারা প্রায় ১৯ বছর থাকেন। তারপর তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা ভারতের মূল ভূখণ্ডে আশ্রয় নেবেন। এভাবেই তারা চলে আসেন গুজরাটের সাঞ্জান শহরে।
‘কিসসা-এ-সানজান’ গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, সেখানে একজন রাজা ছিল ‘জাদি রানা’।জরথুস্ত্রবাদিরা সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা রাজার কাছে যাবে। তারা যখন রাজার কাছে ওই রাজ্যে থাকার জন্য আরজি পেশ করে। তখন রাজা হাতে একটি কানায় কানায় দুধে ভরা পাত্র দেখিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করে আমার রাজ্যে আপনাদের থাকার মতো কোনো জায়গা নেই। জরথুস্ত্রদের প্রধান কিছু চিনি জোগাড় করেন এবং সেই চিনি দুধে মিশিয়ে দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, চিনি যেমন দুধে মিশে যায় আমরাও আপনার সাম্রাজ্যে মিলে-মিশে যাবো। এই উদাহরণ দেখে রাজা অনেক খুশি হন। অতঃপর তাদেরকে থাকার অনুমতি প্রদান করেন এবং তাদেরকে কিছু শর্ত আরোপ করেন। শর্তগুলো হলোঃ
• পার্সি মহিলাদের শাড়ি পড়তে হবে।
• পার্সিরা তাদের সাথে কোন অস্ত্র নিতে পারবে না।
• তাদেরকে গুজরাটি ভাষা শিখতে হবে।
কিন্তু দেখা যায় যে সময়ের সাথে সাথে সাঞ্জান শহরের গুরুত্ব কমতে থাকে। পার্সিরা বিভিন্ন শহরগুলোতে চলে যেতে থাকে। বেশিরভাগ পার্সি বম্বে (মুম্বাই) চলে আসে এবং সেখানে ব্যবসা করতে শুরু করে।
তারা দিনে দিনে বণিক, ব্যবসায়ী, কারিগর হয়ে ওঠে। (১৭০০-১৮০০) শতাব্দীতে যখন ব্রিটিশরা ভারতে আসে তখন বম্বে শহরের গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পায়। ব্রিটিশরা ভালো বণিক এবং ভালো কারিগর খুঁজতে মরিয়া ছিল। এদিকে পার্সিরা বণিক ব্যবসায়ী এবং কারিগরের দিক দিয়ে অনেক এগিয়েছিল। পার্সিরা তাদের সাথে কাজ করার সুযোগ পায়। (১৭০০-১৮০০) শতাব্দীর মাঝে পার্সিরা চীনের সাথে আফিম আর তুলার ব্যবসা শুরু করে। ওই সময় পার্সিদের চাইনিজ সিল্ক খুব পছন্দ ছিল। তাই তারা যখন ব্যবসার কাজে চীনে যেত তাদের স্ত্রীদের জন্য শাড়ি বানিয়ে আনতো। এই শাড়ি ভারতে বিক্রি করা হতো। শাড়িগুলোর নাম ছিল গাড়া।
১৭২৯ সালে চীন সরকার আফিমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। কারণ চীনে তখন মারাত্মকভাবে মাদকাসক্তির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছিল।
১৮৩০ সালের দিকে পার্সিগণ আফিম ব্যবসা বন্ধ করে দেয় এবং সেটার পরিবর্তে তুলার ব্যবসা শুরু করে। ওই সময় তুলার ব্যাপক চাহিদা থাকায় তুলার ব্যবসা করে পার্সিদের জীবনযাত্রার মান আরো উন্নত হতে থাকে। পার্সিরা এতই ধনী এবং সফল হয়েছিল যে, তাদের বাচ্চাদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ানোর মতো সামর্থ্য রাখতো।
সে সময় পার্সি শিক্ষিত এবং সফল জাতিতে পরিণত হয়। পার্সিদের মধ্যে ‘জামশেদজি জিজেভই’ তুলার ব্যবসা করে তখনকার সময় সবচেয়ে ধনী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। আর পার্সিদের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা অনেক দানশীল হয়ে থাকে। পার্সিরা ভারতে অনেক কিছু প্রতিষ্ঠা করেন।
ভারতের সবচেয়ে বড় স্টিলমিল এবং জামশেদপুর শহরের প্রতিষ্ঠাতা জামশেদজি টাটা একজন পার্সি। জে.আর.বি টাটা ভারতের প্রথম লাইসেন্সকৃত পাইলট হন এবং তিনি এয়ারইন্ডিয়া প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও তিনি টাটা মোটরস, টাটা সল্ট, টাইটান ইন্ডাস্ট্রির প্রতিষ্ঠা করেন।
ভারতের প্রথম পরমাণু বিজ্ঞানী হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা। তিনি ভারতের পরমাণু বিজ্ঞানে অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সামরিক বাহিনীতেও পার্সি সম্প্রদায় রেখেছেন উজ্জলতার স্বাক্ষর। সামরিক বাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে পার্সি সম্প্রদায় ভারতকে উপহার দিয়েছে বিভিন্ন বিশিষ্ট সামরিক কর্মকর্তা। ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রথম ফিল্ড মার্শাল একজন পার্সি। ১৯৭১ এর যুদ্ধে (পাকিস্তানের বিরুদ্ধে) ভারত মিত্র বাহিনীর জয়ের মূল পরিকল্পনাকারী ও কারিগর এবং প্রধান নায়ক। তার নাম স্যাম মানেকশ।
তিনি ব্রিটিশ সামরিক সম্মাননা মিলিটারী ক্রস প্রাপ্ত। নৌবাহিনী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা প্রথম পার্সি সামরিক ব্যাক্তিত্ব অ্যাডমিরাল জল কুরসেটজি। লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরদেশির বুর্জোরজি। তিনি ১৯৬৫ সনে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে নিহত হন। যার স্বীকৃতি স্বরুপ তাঁকে “পরম বীর চক্র” পদকে ভূষিত করা হয় (মরণোত্তর)। এটি ভারতের সর্বোচ্চ সামরিক পদক ।
তাদের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তাদের বংশবিস্তার শুধু পুরুষ সদস্যদের মাধ্যমে হয়ে থাকে। এক কথায় কোনো পার্সি পুরুষ যদি অন্য ধর্মের মহিলাকে বিবাহ করে তাহলে তাদের বাচ্চা হবে পার্সি। অন্যদিকে কোনো পার্সি নারী যদি অন্য ধর্মের পুরুষকে বিবাহ করেত তাহলে তাদের বাচ্চাকে হবে পার্সি বলা হবে না।
পার্সিদের বর্তমান জনসংখ্যা ভারতের মোট জনসংখ্যার ০.০০৬%। তাদের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৬৯০০০-৫৭০০০ এর আশেপাশে। তাদের জনসংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে পাচ্ছে। তাদের জনসংখ্যা কম হলেও ভারতে পার্সিদের অবদান অতুলনীয়।


৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে বাংলার স্বাধীনতা এবং এই সব শহীদদের আত্মত্যাগে জন্ম হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ-পাকিস্তান যুদ্ধে ভারত আমাদের সহযোগিতা করেছে ঠিকই কিন্তু এই অর্জন শুধু বাংলাদেশের।