বিশ্বব্যাপী খাদ্য অপচয় বা নষ্ট করার দিক দিয়ে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব। তেলসমৃদ্ধ রাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি যেমন বিশ্বকে মুগ্ধ করেছে, তেমনি খাবারের প্রতি অবহেলা আজ এক ভয়াবহ সামাজিক ও পরিবেশগত সংকটে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক কর্মসূচি (UNEP) এবং খাদ্য অপচয় প্রোগ্রামের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিশ্বের মোট খাদ্য অপচয়ের প্রায় অর্ধেকের জন্য দায়ী মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশটি।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: প্রতি বছর ১.৩ বিলিয়ন টন খাবার নষ্ট
জাতিসংঘের খাদ্য অপচয় প্রোগ্রামের কর্মকর্তা শেফ লাইলা ফাতাল্লাহ জানিয়েছেন, প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ১.৩ বিলিয়ন টন খাবার নষ্ট করা হয়। এই পরিমাণ খাবার দিয়ে পৃথিবীর কোটি কোটি ক্ষুধার্ত মানুষকে বছরের পর বছর খাওয়ানো সম্ভব। কিন্তু বিশ্বমানের এই চিত্রে সৌদি আরবের অবদান অত্যন্ত উদ্বেগজনক—কম সংখ্যক দেশে এত বড় পরিমাণ অপচয় দেখা যায় না।
সৌদি আরবের চমকপ্রদ পরিসংখ্যান
সৌদি আরবের পরিবেশ, পানি ও কৃষিমন্ত্রী আব্দুল রহমান বিন আব্দুল মোহসেন জাতিসংঘের তথ্যের সত্যতা স্বীকার করে জানিয়েছেন, খাদ্য অপচয়ের কারণে দেশে প্রতিবছর প্রায় ৪০ বিলিয়ন রিয়াল নষ্ট হয়। স্থানীয় গবেষণা ও জরিপও একই রকমই ভয়াবহ চিত্র দেখায়: দেশে বছরে মোট প্রায় ৪,০৬০,০০০ টন (৪.০৬ মিলিয়ন টন) খাবার অপচয় হয়, যা উৎপাদিত বা প্রস্তুতকৃত খাদ্যের প্রায় ৩৩%। গবেষণাগুলো বলছে একজন সাধারণ সৌদি নাগরিক গড়ে প্রায় ১৮৪ কেজি খাবার অপচয় করেন—যা অনেক দেশের গড়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি।
কোন কোন খাবার বেশি নষ্ট হয়
গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবজি ও প্রধান staple খাদ্যগুলোতে সবচেয়ে বেশি অপচয় হচ্ছে। বছরে অপচ্যুত পরিমাণের কিছু উদাহরণ:
সবজি মোট: ৩৩৫,০০০ টন (ধুন্দুল ৩৮,০০০ টন, আলু ২০২,০০০ টন, শসা ৮২,০০০ টন, পেঁয়াজ ১১০,০০০ টন, টমেটো ২৩৪,০০০ টন)।
আটা এবং রুটি: ৯১৭,০০০ টন
চাল: ৫৫৭,০০০ টন
মুরগির মাংস: ৪৪৪,০০০ টন
ভেড়ার মাংস: ২২,০০০ টন
ফল যেমন খেজুর: ১৩৭,০০০ টন, কমলা: ৬৯,০০০ টন, তরমুজ: ১৫৩,০০০ টন।
এই পরিসংখ্যান দেখলে সহজেই বোঝা যায়—গৃহস্থালি থেকে শুরু করে কৃষি উৎপাদন, রেস্টুরেন্ট ও হোটেল-বাফে—সবখানেই অপচয় ব্যাপক।
অপচয়ের মূল কারণসমূহ
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও দামের অনুধাবন: তেল-সমৃদ্ধি ও উচ্চ আয়ের কারণে খাদ্যদ্রব্য তুলনামূলকভাবে ‘সাশ্রয়ী’ মনে হয়; ফলে অপচয়কে সমাজ বড় সমস্যা হিসেবে নেয় না।
সাংস্কৃতিক প্রতীয়মানতা: অতিথি আপ্যায়ন ও সৌজন্য প্রদর্শনের লক্ষ্যেই অতিরিক্ত রান্না করা হয়—খাবার অনেক ক্ষেত্রে সেভাবে খরচ করা হয় না।
বড় আয়োজন ও বাফে সংস্কৃতি: বিয়েবাড়ি, সরকারি আয়োজনে প্রাচুর্য—তার ফলে অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত প্রস্তুতি হয়।
সংরক্ষণ ও পুনর্বণ্টন ব্যবস্থার ঘাটতি: অতিরিক্ত থাকা খাবার দ্রুত ও সঠিকভাবে দরিদ্রদের কাছে পৌঁছে দেয়ার কার্যকর ব্যবস্থা নেই।
অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও মানবিক প্রভাব
খাবার অপচয় কেবল খাদ্যরাশি ক্ষতি করে না—এর সঙ্গে জড়িত পানি, শক্তি, শ্রম, পরিবহন ও সংরক্ষণ খরচও বৃথা যায়। মরুভূমি-প্রধান সৌদি আরবে পানি অত্যন্ত মূল্যবান; খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত সেই পানিও অপচয় হচ্ছে। পাশাপাশি, খাবার পচায় মিথেন গ্যাস নির্গত হয়, যা গ্রিনহাউস প্রভাব বাড়ায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। মানবিক দিক থেকে—বিশ্বের অনেক দেশে মানুষ ক্ষুধায় কষ্ট পায়, আর অন্যদিকে সৌদি আরবে কোটি কোটি কেজি খাবার প্রতিনিয়ত নষ্ট হচ্ছে—এটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রশ্ন তোলে; ইসলাম বিপুল অপচয় নিরুৎসাহিত করে—সুতরাং এই সমস্যা স্থানীয় মূল্যবোধের সঙ্গেও ধাক্কা খায়।
সমাধানের উপায় (প্রস্তাবনা)
জাতীয় সচেতনতা বৃদ্ধি: মিডিয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মসজিদ কেন্দ্রিক প্রচারণার মাধ্যমে কম রান্না ও সেভিংয়ের গুরুত্ব বুঝাতে হবে।
ফুড ব্যাংক ও দ্রুত পুনর্বণ্টন নেটওয়ার্ক: অতিরিক্ত রান্না করা খাবার সংগ্রহ করে দ্রুত দরিদ্রদের মাঝে বিলি করার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
আইন ও প্রণোদনা: হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও বড় আয়োজনে অপচয় কমাতে নিয়ম ও অনুদান/কর ছাড়ের মতো প্রণোদনা যেতে পারে।
টেকনোলজি ব্যবহার: স্মার্ট কিচেন ম্যানেজমেন্ট, খাবার রিলোকেশন অ্যাপ ও উন্নত শীতল সংরক্ষণ প্রযুক্তি সাহায্য করবে অপচয় কমাতে।
খাবার অপচয় কেবল সংখ্যার খেলা নয়—এটি অর্থ, পরিবেশ ও মানবতার সাথে জড়িত একটি বড় সমসত্য়া। সৌদি আরবে প্রতিদিন নষ্ট হওয়া প্রায় ১১ হাজার টন খাদ্য যদি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হতো, তাহলে বাংলাদেশের মতো দুইটা একটি দেশকে একদিনের খাবার দেয়া যেত অথবা কয়েক কোটিরও বেশি মানুষের একদিনের খাদ্য সরবরাহ করতে পারত। এটা দেখায়—সামান্য করেই আমরা অসাধ্যসাধন করতে পারি: পরিকল্পনা, সচেতনতা ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে অপচয় বহু কমানো যাবে। প্রতিটি বাঁচানো দানা খাবার মানে এক ক্ষুধিত মানুষের মুখে হাসি — এবং এটাই শেষ লক্ষ্য হওয়া উচিত।

